Hot Posts

6/recent/ticker-posts

বিষয় হিসেবে ভূগোল (Geography as a discipline)


১. বিষয় হিসেবে ভূগোল

১.১ ভূগোলের সংজ্ঞা

২. ভূগোল চর্চার সূত্রপাত

২.১. প্রাচীন ভূগোলবিদ

২.২. আবিষ্কারের যুগ

২.৩. আধুনিক ভূগোলের উত্থান

৩. ভূগোলের বিভিন্ন শাখা

৩.১. প্রাকৃতিক ভূগোল

৩.২. মানব ভূগোল

৩.৩. ভৌগোলিক কৌশল

৩.৪. আঞ্চলিক ভূগোল

৪. উপসংহার

 

 

 

     ১. শাস্ত্র বা বিষয় হিসেবে ভূগোল (Geography as a discipline) 

মানুষ ও ভূমির সম্পর্কের মধ্যে রয়েছে প্রকৃতির উপর মানুষ নির্ভরশীলতা এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের কার্যকলাপের প্রভাব। মানব সমাজের বিকাশের সাথে সাথে মানুষ ও ভূমির সম্পর্কের বিষয়বস্তু পরিবর্তিত হয়। মানব-ভূমি সম্পর্ক গবেষণা আধুনিক ভূগোলের বিকাশের ভিত্তি।   

             
     (ভূগোল শব্দটির ইংরেজী প্রতিশব্দ Geography. " Geography " শব্দটি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে গ্রীক পণ্ডিত ইরাটোস্থেনিস (Eratosthenes) দ্বারা সর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল। Geography শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ  geo(ge) এবং graphos থেকে সৃষ্টি হয়েছে। geo শব্দের অর্থ পৃথিবী আর  graphos শব্দের অর্থ  বর্ণনা। সুতরাং, ভূগোলের অর্থ পৃথিবীর  বর্ণনা (Geography means the description of the earth)।

     ১.১. ভূগোলের সংজ্ঞাঃ(Definition) ভূগোলের নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা (Definition) নেই।বিভিন্ন ভূগোলবিদ বা বিজ্ঞানী ভূগোলের বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। এদের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলোঃ

    i. গ্রিক ভূগোলবিদ ইরাটোসথেনিস এর মতে , “Geography is the science of the surface of the earth and it inhabitants” অর্থাৎ, ভূগোল এমন একটি বিজ্ঞান যা পৃথিবী এবং ভূপৃষ্ঠে বসবাসকারী মানুষের বিবরণ দেয়।

     ii. মিশরের অধিবাস ক্লডিয়াস টলেমি এর মতে,”ভূগোল সেই মহান বিষয় যা মহাবিশ্বের মধ্যে পৃথিবীকে এক ঝলক দেখায়”

     iii.গ্রিক ভূগোলবিদ স্ট্র‍্যাবো (strabo) এর মতে,  ভূগোল পৃথিবীর জল ও স্থলে বসবাসকারী সমস্ত জীব ও পৃথিবীর বৈশিষ্ট্যগুলিকে ব্যাখ্যা করে।

     iv. আলেকজান্ডার ভন হামবোল্ট (Alexander von Humboldt এর মতে, পৃথিবীতে ভূগোল হল প্রকৃতির সাথে সম্পর্কিত বিজ্ঞান। পৃথিবীতে যা কিছু পাওয়া যায় ভূগোল তার বর্ণনা করে। হামবোল্ট ভূগোলকে আদি বিজ্ঞান (original science) হিসেবে ভূষিত করেছেন।

      v. বৃটিশ ভুগোলবিদ জেমস ফেয়ারগ্রিভের (James Fairgrieve) এর ভাষায়, ভূগোল হল এমন এক বিজ্ঞান যা পৃথিবী ও মানুষের পারস্পরিক সম্বন্ধ সম্পর্কে আলোচনা করে। Geography is the science which treats the relation between the Earth and the man’

    vi. ভূগোলবিদ ই. হান্টিংটন (E. Hantintong) বলেছেন - পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, শিলামন্ডল, বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমিরূপ (পাহাড়, পর্বত), মৃত্তিকা, অরণ্য, জলবায়ু এবং দেশান্তর কিভাবে মানুষ, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের ভাগ্য এবং তার কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ হয়   তা আলোচনা করে যে শাস্ত্র তাকে ভূগোল বলে।

     vii. প্রোফেসর ই. এ ম্যাকনি (professor E-A Macnee) এর মতে মানুষের বাসভূমি হিসেবে পৃথিবীর আলোচনা বা বর্ণনাই ভূগোল। (Geography is the study of the Earth as the home of man.)

 

     vii. এল ডি স্ট্যাম্প (L.D. Stamp) বলেছেন– ভূগোল হল পৃথিবী ও তার অধিবাসীদের বিবরণ সংক্রান্ত বিষয়। (Geography is a description of the world and its inhabitants.)

 

     ix. ভূগোলবিদ পিটার হ্যাগেটের (peter Haggett) মতে, যে শাস্ত্র ভূ-পৃষ্ঠকে মানব গোষ্ঠীর বসবাসের দেশ হিসেবে পর্যালোচনা করে, তাকে ভূগোল বলা হয়।(Geography is the study of earth’s surfare as the space within which the human Population lives) 

     x. National Geographic society এর মতে “ভূগোল হল স্থানসমূহের অধ্যয়ন ও মানুষ এবং তাদের পরিবেশের মধ্যেকার সম্পর্ক। “(Geography is the study of places and the relationships between people and their environments.)

    উপরোক্ত সংগাগুলোর আলোকে বলা যায়, ভূগোলবিদরা পৃথিবী পৃষ্ঠের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানব সমাজ সম্পর্কে অন্বেষণ করেন। মানব সংস্কৃতি কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, যেভাবে কোন স্থান বা স্থানসমূহ মানুষের উপর প্রভাব ফেলতে পারে তা ভূগোল্বিদগণ পরীক্ষা করেন। ভূগোল বোঝার চেষ্টা করে, কোন জিনিস কোথায় পাওয়া যায়, কেন সেগুলো ওই স্থানে আছে এবং কীভাবে তারা সময়ের সাথে সাথে বিকশিত হয় এবং পরিবর্তিত হয়।

     ২.ভূগোল চর্চার সূত্রপাত 

     ২.১. প্রাচীন ভূগোলবিদ (Ancient Geographers)

     ইরাটোসথেনিস এবং অন্যান্য গ্রীকরা পৃথিবীর অনেক স্থানের সাথে সম্পর্কিত তাদের স্বদেশ কোথায় অবস্থিত, তাদের নিজস্ব এবং অন্যান্য স্থানগুলি কেমন ছিল, মানুষ এবং পরিবেশের সম্পর্ক কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে সে সম্পর্কে একটি ধার।ণা তৈরি করেছিল।

     গ্রীকরাই প্রথম ভূগোল সম্পর্কে আলোচনা করেছে এমন কিন্তু না। মানব ইতিহাস জুড়ে, বেশিরভাগ সমাজই পৃথিবীতে তাদের অবস্থান , তাদের চারপাশের মানুষ এবং পরিবেশ সম্পর্কে কিছু বোঝার চেষ্টা করেছে। মেসোপটেমিয়ানরা মাটির ট্যাবলেটে মানচিত্র খোদাই করে, যার মধ্যে কিছু আজও টিকে আছে। বিশ্বের মানচিত্র  তৈরির প্রথম পরিচিত প্রচেষ্টা হয় ব্যাবিলনীয়দের মধ্যে, যা ইমাগো মুন্ডি (Imago Mundi) নামে পরিচিত। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে তৈরি এই মানচিত্রটিতে যদিও ভৌগোলিক সঠিক উপস্থাপনার পরিবর্তে ব্যাবিলনীয় সমাজের রূপক এবং  আধ্যাত্মিকতার উপস্থাপনাই বেশি দেখা যায়। মেসোপটেমিয়ার মানচিত্রগুলি আরও ব্যবহারিক ছিল,যেগুলোতে সেচ নেটওয়ার্ক এবং জমির মালিকানা চিহ্নিত করা হয়।  

     বিশ্বজুড়ে আদিবাসীরা ইরাটোস্থেনিসের অনেক আগে থেকেই ভৌগোলিক ধারণা ও অনুশীলন গড়ে তুলেছিল। উদাহরণস্বরূপ, পলিনেশিয়ান দক্ষ নাবিকেরা (Navigators) ৩০০০ বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ জুড়ে দীর্ঘ-পরিসরের সমুদ্রযাত্রা শুরু করেছিল। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের লোকেরা স্রোত, বাতাসের ধরণ ও দ্বীপের অবস্থান কল্পনা এবং মনে রাখার জন্য প্রাকৃতিক উপকরণ দিয়ে তৈরি নেভিগেশন চার্ট (navigation charts) ব্যবহার করত।

     প্রকৃতপক্ষে, মানচিত্র  সম্ভবত অনেক জায়গায় লেখার আগেই এসেছিল, তবে প্রাচীন গ্রীক ভূগোলবিদরা  বিশেষভাবে প্রভাবশালী ছিলেন। তারা ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়ার কিছু অংশ সহ গ্রীক শহর-রাজ্যগুলির খুব বিশদ মানচিত্র তৈরি করেছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণভাবে বলতে গেলে, কীভাবে এবং কেন পৃথিবী পৃষ্ঠে বিভিন্ন মানব ও প্রাকৃতিক নিদর্শন তৈরি হয়েছিল এবং কেন এক স্থান, অন্য স্থান থেকে ভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ছিল- সে সম্পর্কেও গ্রীকরা প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল, এবং এই সম্পর্কিত প্রশ্নগুলির উত্তর দেওয়ার প্রচেষ্টার ফলে তারা বুঝতে পেরেছিল যে, পৃথিবী গোলাকার। তারা পৃথিবীর পরিধি গণনা করতে এবং জায়গায় জায়গায় জনসংখ্যার ঘনত্বের পার্থক্যের কারণ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করতে পেরেছিলে।  

     মধ্যযুগে, মূলত ইউরোপীয়রা ভূগোলের একাডেমিক সাধনা প্রায় বন্ধ করে দেয়। এ সময়ে ভূগোলের অগ্রগতি মূলত মুসলিম বিশ্বের (মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার) বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে হয়। ইসলামী স্বর্ণযুগের ভূগোলবিদরা, একটি গ্রিডের উপর আয়তক্ষেত্রাকার মানচিত্রের ধারণা প্রদান করেন, এই মানচিত্র ব্যবস্থা এখনও চালু আছে । এছাড়াও ইসলামিক পন্ডিতরা কৃষিতে মানুষ ও স্থানের প্রভাব, নির্দিষ্ট আবাসস্থল বা পরিবেশের জন্য কোন ফসল এবং পশুসম্পদ সবচেয়ে উপযুক্ত তা নির্ধারণ করে।

     মুসলিম বিশ্বের পাশাপাশি এশিয়ার চীনা সাম্রাজ্যও ভূগোলে ব্যাপক অবদান রেখেছিল। প্রায় ১০০০ জন, চীনা অভিজ্ঞ নাবিক ভূগোলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছিল: তারাই প্রথম সমুদ্র যাত্রার উদ্দেশ্যে কম্পাস ব্যবহার করেছিল। চতুর্দশ (১৪০০) -এর দশকের গোড়ার দিকে, অনুসন্ধানকারী ঝেং(Zheng) চীন সাগর এবং ভারত মহাসাগরের সীমান্তবর্তী ভূমিতে সাতটি সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন, এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে চীনের প্রভাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

     ২.২. আবিষ্কারের যুগ (Age of Discovery)

     ইতালীয় অভিযাত্রী মার্কো পোলোর ত্রয়োদশ শতকের ভ্রমণের মাধ্যমে, এশিয়ার মশলার প্রতি ইউরোপীয়দের আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পূর্ব এশীয় ও আরব বণিকদের কাছ থেকে মশলা সংগ্রহ করা ব্যয়বহুল ছিল। এছাড়া উসমানীয় সাম্রাজ্যের কনস্টান্টিনোপল (Constantinople) জয়ের সাথে সাথে ইউরোপীয় মশলা বাণিজ্যের একটি প্রধান স্থল পথ হারিয়ে যায়। এই কারণগুলি ছাড়াও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণে এবং খ্রিস্টান ও ইসলামিক সমাজের মধ্যে প্রতিযোগিতার দরূণ, ইউরোপীয় দেশগুলি নতুন সমুদ্র পথের সন্ধানে অভিযাত্রী পাঠাতে অনুপ্রাণিত হয়। পঞ্চদশ এবং সপ্তদশ শতকের মধ্যে এই সময়কালটি ইউরোপ সহ পশ্চিমাদের নিকট অনুসন্ধানের যুগ বা আবিষ্কারের যুগ হিসাবে পরিচিত।

 

     আবিষ্কারের যুগের সূচনার সাথে সাথে, ভূগোল অধ্যায়ন ইউরোপে জনপ্রিয়তা ফিরে পায়। চতুর্দশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রিন্টিং প্রেসের উদ্ভাবন, ভৌগোলিক জ্ঞান বিশেষত মানচিত্রের জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। জাহাজ নির্মাণ এবং নৌচলাচলের উন্নতি আরও সমুদ্র যাত্রা ও অনুসন্ধানকে সহজতর করে, যা মানচিত্র এবং ভৌগলিক তথ্যের ব্যবহারকে ব্যাপকভাবে উন্নত করেছে। 

     বৃহত্তর ভৌগোলিক বোঝাপড়া ইউরোপীয় শক্তিগুলিকে বিশ্বব্যাপী প্রভাব বিস্তার করতে সাহায্য করে। আবিষ্কারের  যুগে, ইউরোপীয় দেশগুলো সারা বিশ্বে উপনিবেশ স্থাপন করে। উন্নত পরিবহন, যোগাযোগ এবং নৌচলাচল প্রযুক্তি যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলিকে আমেরিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং আফ্রিকার মতো দূরে উপনিবেশ স্থাপন করতে সাহায্য করে। যা ইউরোপীয় শক্তির জন্য লাভজনক ছিল, কিন্তু এসব উপনিবেশগুলিতে বসবাসকারী লোকেদের জন্য অনাকাংখিত পরিবর্তন আনে। ১৪৯২ সালে যখন কলম্বাস আমেরিকায় অবতরণ করেন, তখন লক্ষ লক্ষ আদিবাসী সেখানে বসবাস করত। ষোড়োশ সালের মধ্যে, আমেরিকার আদিবাসী জনসংখ্যার 90 শতাংশ ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের দ্বারা আনা সহিংসতা এবং রোগ দ্বারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

     ভূগোল এমন একটি বিষয়, যা শুধু উপনিবেশ স্থাপনের জন্য সহায়ক ভূমিকা রেখেছে এমন নয়, এটি মানুষকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে তারা কোন একটি গ্রহে বাস করেন। ভূগোলের এই ভূমিকার জন্য পরবর্তীতে স্কুলে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠে ভূগোল।   

     ২.৩. আধুনিক ভূগোলের উত্থান (Emergence of Modern Geography)

     ভূগোল আন্তঃবিভাগীয় বিষয়, যার অর্থ ভূগোলের আলোচনা একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। ভূগোল বিভিন্ন বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত - মানুষ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, বসতি, গাছপালা, ভূমিরূপ এবং আরও অনেক       কিছু। ভূগোল স্থানিক প্রশ্ন (spatial questions) জিজ্ঞাসা করে কীভাবে এবং কেন বিভিন্ন জিনিস পৃথিবী পৃষ্ঠে নির্দিষ্ট উপায়ে সাজানো থাকে। ভূগোল, বিভিন্ন তুলানামূলক স্কেলে এই বিভিন্ন বন্টন ব্যবস্থার দিকে নজর দেয়। পৃথিবী পৃষ্ঠে, বিভিন্ন মানুষ এবং প্রাকৃতিক ক্রিয়াকলাপের মিথস্ক্রিয়ায় আমরা কিভাবে বাস করি,ভূগোল বিশ্বের সেই বৈশিষ্ট্যগুলিকে চিহ্নিত করে  এবং সে সম্পর্কে  প্রশ্ন করে।  

অতএব, ভূগোল বুঝতে চায়ঃ-

   (i)কোন জিনিস কোথায় পাওয়া যায় এবং কেন সেগুলি ওই জায়গাগুলিতে আছে।

   (ii) একই সাথে থাকা অথবা দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত জিনিসগুলি কীভাবে সময়ের সাথে একে অপরকে প্রভাবিত করে।

   (iii) কোন স্থান ও সেই স্থানে বসবাসকারী লোকেরা কোন বিশেষ উপায়ে উন্নতি লাভ করে এবং পরিবর্তিত হয়।

    এই প্রশ্নগুলি উত্থাপন করা "ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ" এর প্রধাণ আলোচ্য বিষয়।

     অনুসন্ধান(Exploration), দীর্ঘকাল ধরে ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গি বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অনুসন্ধান কেবলমাত্র অপরিচিত স্থান পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ নয়; এর অর্থ স্থানিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং পরিবেশগত উপাদানগুলির মধ্যে সম্পর্ককে নথিভুক্ত করা এবং সংযুক্ত করা।

     এখনও মানচিত্রের ব্যবহার অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, তবে কোন অনুসন্ধান কাজ, উপগ্রহ থেকে গৃহিত ছবি ব্যবহার করে অথবা সাক্ষাৎকার থেকে তথ্য সংগ্রহ করেও করা যেতে পারে। অথবা, বিভিন্ন স্থানের জিনিসগুলির মধ্যেকার সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমেও কোন একটি স্থানের উপাত্ত সংগ্রহ করা যেতে পারে এবং সেই স্থানের উন্নয়নের উপায় নির্ধারণ করা যেতে পারে।

     ভৌগলিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ শুধুমাত্র কোন জিনিস কোথায় অবস্থিত তা নিয়ে নয়, বরং ভূগোলের কেন্দ্রীয় ফোকাস থাকে কোন কিছু "কোথায় এবং কেন"।

     ভৌগোলিক গবেষণা থেকে আসা ফলাফল "কেন, কোথায়" প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার গুরুত্ব দেখায়। উদাহরণ স্বরূপ, আটলান্টিক মহাসাগরের উভয় পাশের মহাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের তুলনা করে এই ধারণার জন্ম দিয়েছে যে পৃথিবী পৃষ্ঠ ধীরে ধীরে চলমান প্লেটের সমন্বয়, যা প্লেট টেকটোনিক্স দ্বারা গঠিত।

 

     মানব বসতির ভৌগোলিক বন্টন দেখিইয়েছে, কীভাবে অর্থনৈতিক শক্তি এবং পরিবহনের পদ্ধতি শহর এবং শহরের অবস্থানকে প্রভাবিত করে। উদাহরণস্বরূপ, ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মার্কিন শহরতলির বৃদ্ধিতে ও গাড়ির মালিকানার দ্রুত বৃদ্ধির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তঃরাজ্য হাইওয়ে সিস্টেমের ভূমিকা রয়েছে।  

     রোগ বিস্তারের ভৌগোলিক বিশ্লেষণসমূহ, নির্দিষ্ট রোগের বিকাশ  এবং বিস্তারের জন্য কিছু অবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এক্ষেত্রে, ডাঃ জন স্নো (Dr. John Snow )-এর কলেরা মানচিত্রটি কথা উল্লেখ করার মতো৷ ১৮৫৪ সালে ইংল্যান্ডের লন্ডনে কলেরা ছড়িয়ে পড়লে,  তিনি রাস্তার মানচিত্রের সাহায্যে “ব্রড স্ট্রিট” এবং “কেমব্রিজ স্ট্রিট” এর কোণের একটি জলের পাম্পকে প্রাদুর্ভাবের উৎস হিসাবে সনাক্ত করতে সক্ষম হন।   ভগোলিক দৃষ্টিভংগি সমস্যার উৎস (একটি নির্দিষ্ট পাম্প থেকে পানি) সনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং মানুষকে রোগ এড়াতে সাহায্য করে (সেই পাম্প থেকে পানি এড়িয়ে চলা)।

 

     মানুষের ক্রিয়াকলাপের প্রভাব সম্পর্কিত ভৌগোলিক অনুসন্ধানসমূহ, পৃথিবী পৃষ্ঠকে পরিবর্তন করতে মানুষের ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা দেয়। কৃত্রিম বর্জ্য দ্বারা জল দূষণের মতো হুমকি স্থানিক পরিবর্তনকে প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, ভৌগোলিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরে ভাসমান প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র টুকরাগুলির আয়তন প্রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গ রাজ্যের আকারের সমান।

 

     ভৌগোলিক দৃষ্টিভঙ্গির এই উদাহরণগুলি ব্যাখ্যা করতে সামর্থ হয়েছে, কেন ভৌগোলিক অধ্যয়ন এবং গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। আশা করা যায়, একবিংশ শতকের পরিবেশ দূষণ, দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং জাতিগত সংঘাত সহ আরও অনেক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় ভৌগোলিক দৃষ্টিভংগি সক্ষম হবে ।

 

     ৩. ভূগোলের বিভিন্ন শাখা (different branches) 

     ভূগোলের অধ্যয়ন এত বিস্তৃত যে বিষয়টিকে সাধারণত কতগুলো বিশেষ অংশে ভাগ করা সম্ভব। ভূগোলকে, (i) প্রাকৃতিক ভূগোল (ii) মানব ভূগোল (iii) ভৌগলিক কৌশল এবং (iv)আঞ্চলিক ভূগোল এই চারটি শাখায় বিভক্ত করা হয়েছে।

 

     ৩.১. প্রাকৃতিক ভূগোল (Concept and scope of Physical Geography)

     প্রাকৃতিক পরিবেশ হল প্রাকৃতিক ভূগোলবিদদের প্রাথমিক অধ্যয়নের প্রধান ক্ষেত্র, যদিও অনেক প্রাকৃতিক ভূগোলবিদও দেখেন, কিভাবে মানুষ প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করেছে। প্রাকৃতিক ভূগোলবিদরা পৃথিবীর ঋতু, জলবায়ু, বায়ুমণ্ডল, মাটি, স্রোত, ভূমিরূপ এবং মহাসাগর সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন। প্রাকৃতিক ভূগোলের শাখার মধ্যে রয়েছে ভূরূপবিদ্যা, হিমবিদ্যা, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, পানিবিদ্য, জলবায়ুবিদ্যা, জৈব ভূগোল এবং সমুদ্রবিদ্যা। 

     ভূরূপবিদ্যা হল ভূমিরূপের আকৃতির অধ্যয়ন। ভূ-প্রকৃতিবিদরা বায়ু, বরফ, নদী, ক্ষয়, ভূমিকম্প, আগ্নেয়গিরি, জীবন্ত জিনিস যা পৃথিবী পৃষ্ঠের আকৃতি পরিবর্তন করে এমন অন্যান্য শক্তির প্রকৃতি এবং প্রভাব বিশ্লেষণ করেন।

     হিমবাহবিদরা, পৃথিবীর বরফ ক্ষেত্র, পৃথিবীর জলবায়ুর উপর বরফ ক্ষেত্রের প্রভাব, হিমবাহ এবং আইসবার্গের (icebergs) বৈশিষ্ট্য এবং বন্টন নথিভুক্ত করেন। হিমবিজ্ঞানীদের দ্বারা সংগৃহীত উপাত্ত গত শতাব্দীতে আর্কটিক এবং অ্যান্টার্কটিকার বরফের পশ্চাদপসরণ চিহ্নিত করেছে।

     মৃত্তিকা ভূগোলে মাটি তৈ্রির প্রক্রিয়া, মাটির পরিবর্তন এবং মাটিকে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।  

     পানিবিদ্যা হল পৃথিবীর পানিরর অধ্যয়ন: পানির বৈশিষ্ট্য, বন্টন এবং প্রভাব। জলবিদরা বিশেষত জলের গতিবিধি নিয়ে উদ্বিগ্ন কারণ এটি সমুদ্র থেকে বায়ুমণ্ডলে এবং তারপরে পৃথিবীর পৃষ্ঠে ফিরে আসে। জলবিদরা স্রোত, হ্রদ, মাটি এবং ভূগর্ভস্থ জলাশয়ে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে পানিচক্র অধ্যয়ন করেন। পানিবিদরা এমন অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে যা বাঁধ নির্মাণ বা অপসারণ, সেচ ব্যবস্থা ডিজাইন, পানির গুণমান পর্যবেক্ষণ, খরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং বন্যার ঝুঁকির পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

     জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠের উপর এর প্রভাব অধ্যয়ন করেন। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এল নিনোর বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। তারা এল নিনোর কারণে সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নাটকীয়তা বিশ্লেষণ করে, যেমন পেরুতে বন্যা, ভারতীয় উপমহাদেশে খরা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ভারী বৃষ্টিপাত বা মিনেসোটায় শীতকালে গরমের উদ্ভব ।

     জৈব ভূগোলবিদরা উদ্ভিদ এবং প্রাণীদের বিস্তারের উপর ভিত্তি করে পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন। উদাহরণস্বরূপ, একজন জৈব ভূগোলবিদ একটি নির্দিষ্ট মাকড়সার প্রজাতির বসবাসকারী বিশ্বের সমস্ত স্থান দ্বার, সেই জায়গাগুলির মধ্যে কী মিল রয়েছে তা নথিভুক্ত করতে পারেন।

     সমুদ্রবিদ্যা, প্রাকৃতিক ভূগোলের সাথে সম্পর্কিত একটি শাখা। যা বিশ্বের মহাসাগরের প্রাণী, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা, স্রোত এবং পরিবেশের সম্পর্কে অধ্যয়ন করে।

     আজ, সমুদ্রবিজ্ঞানীরা পানি দূষণের প্রভাবের উপর গবেষণা পরিচালনা করেন, সুনামি ট্র্যাক করেন, অফশোর অয়েল রিগ ডিজাইন করেন, পানির নিচে লাভার অগ্ন্যুৎপাতের তদন্ত করেন এবং বিষাক্ত শেওলা থেকে শুরু করে সব ধরনের সামুদ্রিক জীবের অধ্যয়ন করেন।

 

     প্রাকৃতিক ভূগোলের শাখা সমূহ (Branches of Physical Geography):   

    ক) হিমবাহবিদ্যা (Glaciology)

    খ) ভূমিরূপ বিদ্যা (Geomorphology)-

    গ) ভূতত্ত্ববিদ্যা(Geology)-

    ঘ) হিমবাহবিদ্যা (Glaciology)

     ঙ) আবহবিদ্যা (Meteorology)–

     চ) জলবায়ু বিদ্যা (Climatology)- 

     ছ) সমুদ্রবিদ্যা (Oceanography)-

     জ) মৃত্তিকা ভূগোল (Soil Geography)

     ঝ) মহাকাশ বা জ্যোতির্বিদ্যা (Astronomy)-

     ঞ) পানিবিদ্য(Hydrology)

     ট) জৈব ভূগোল (Bio Geography)

 

     ৩.২. মানব ভূগোল (Human Geography)

     মানব ভূগোল পৃথিবী পৃষ্ঠে মানুষ ও সংস্কৃতির বিস্তার এবং মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের সাথে সম্পর্কিত। একজন মানব ভূগোলবিদ ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক কার্যাবলীর স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক প্রভাব অনুসন্ধান করেন। ভোক্তারা কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ও বাজারের সাথে সামঞ্জস্যতা রক্ষা করে এবং বাজারসমূহ তার বিশাল ভোক্তার চাহিদা পূরণে কীভাবে সাড়া দেয় সে সম্পর্কেও অনুসন্ধান করে মানব ভূগোলবিদরা ।

     মানব ভূগোলবিদরা অধ্যয়ন করেন, লোকেরা কীভাবে তাদের পরিবেশ ব্যবহার করেন এবং তা পরিবর্তন করেন। উদাহরণস্বরূপ, যখন লোকেরা তাদের প্রাণীদের একটি অঞ্চলে মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায় চরাতে দেয়, তখন মাটি ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং তৃণভূমি বিরান ভূমিতে রূপান্তরিত হয়। ভূদৃশ্য(Landscape) ও সেইসাথে কৃষি উৎপাদনের উপর মাত্রাতিরিক্ত পশুচারণ এর প্রভাব মানব ভূগোলবিদদের জন্য অধ্যয়নের একটি ক্ষেত্র।

     প্রকৃতপক্ষে, মানব ভূগোলবিদরা ভৌগোলিক স্থান জুড়ে   রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাগুলি কীভাবে সংগঠিত হয় তা অধ্যয়ন করেন। এর মধ্যে রয়েছে সরকার, ধর্মীয় সংস্থা এবং বাণিজ্য অংশীদারিত্ব। এই গোষ্ঠীগুলির সীমানা ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। 

     মানব ভূগোলের প্রধান বিষয়গুলো মানুষের বিভিন্ন ধরণের   কার্যকলাপ বা জীবনযাপনের উপায়গুলির সাথে সম্পর্কিত। মানব ভূগোলের কিছু উদাহরণের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক ভূগোল, সাংস্কৃতিক ভূগোল, রাজনৈতিক ভূগোল, সামাজিক ভূগোল এবং জনসংখ্যার ভূগোল। মানব ভূগোলবিদরা যে অতীতের ভৌগোলিক নিদর্শন এবং প্রক্রিয়াগুলি অধ্যয়ন করেন তা ঐতিহাসিক ভূগোলের উপশাখা।

     মানুষ এবং পরিবেশের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে আগ্রহী অনেক ভূগোলবিদ সাংস্কৃতিক ভূগোল এবং রাজনৈতিক ভূগোলের উপশাখায় কাজ করেন। কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ মানব সংস্কৃতির বিকাশকে প্রভাবিত করে, যেমন জলবায়ু একটি অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করে তা অধ্যয়ন করে সাংস্কৃতিক ভূগোলবিদরা । রাজনৈতিক ভূগোলবিদরা মানুষ এবং তাদের পরিবেশের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া, সেইসাথে পানির মতো বিষয়গুলোর অধিকার নিয়ে বিরোধের পরিবেশগত দ্বন্দ্ব নিয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব অধ্যয়ন করেন।

     কিছু মানব ভূগোলবিদ মানুষের স্বাস্থ্য এবং ভূগোলের মধ্যে সংযোগের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। উদাহরণস্বরূপ, স্বাস্থ্য ভূগোলবিদরা মানচিত্র তৈরি করে যা নির্দিষ্ট রোগের অবস্থান এবং বিস্তারকে চিহ্নিত করে। তারা স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ভৌগোলিক বৈষম্য বিশ্লেষণ, মানব স্বাস্থ্যের উপর পরিবেশের প্রভাব, বিশেষ করে বিকিরণ, সীসার বিষক্রিয়া, পানি দূষণের মতো পরিবেশগত বিপদের প্রভাব সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন।

 

     মানব ভূগোলের শাখা সমূহ (Branches of Human Geography):

     ক। জনসংখ্যা ভূগোল (Population Geography)

     খ। রাজনৈতিক ভূগোল (Political Geography)

     গ। সামাজিক ভূগোল (Social Geography)

     ঘ। সাংস্কৃতিক ভূগোল (Cultural Geography)

     ঙ। অর্থনৈতিক ভূগোল (Economical Geography)

     চ। কৃষি ভূগোল (Agriculture Geography)

     ছ। বানিজ্যিক ভূগোল (Commercial Geography)  

    জ। ঐতিহাসিক ভূগোল (Historycal Geography)

    ঝ।ভৌগোলিক চিন্তন ও ধারণা (Geographical Thoths and concepts)

    ঞ। পরিবেশ ভূগোল (Environmental Geography)

     ট। চিকিৎসা ভূগোল (Medical Geography) 

 

 

 

 

     ৩.৩. ভৌগোলিক কৌশল (Geographic Techniques)

     বিভিন্ন পদ্ধতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভৌগোলিক প্রক্রিয়াগুলিকে বিশ্লেষণ এবং সেগুলি প্রদর্শন করার উপায়সমূহ অধ্যয়ন করেন ভৌগোলিক কৌশল বিশেষজ্ঞরা (Specialists in geographic techniques)। মানচিত্রাংকন বিদ্যা(Cartography), সম্ভবত এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়। মানচিত্রাংকন বিদ্যা যুগে যুগে ভূগোলের জন্য সহায়ক হয়েছে।

     বর্তমানে, পৃথিবীর প্রায় সমগ্র পৃষ্ঠর নির্ভুল মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে, এবং এই তথ্যের বেশিরভাগই ইন্টারনেটে তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়। এই ধরণের ওয়েবসাইটগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল গুগল আর্থ। যা, "পৃথিবীর যেকোন জায়গায় স্যাটেলাইট ইমেজ, মানচিত্র, ভূখণ্ড, 3D বিল্ডিং, মহাকাশের ছায়াপথ থেকে সমুদ্রের গিরিখাত পর্যন্ত দেখতে দেয়।" মোটকথা, যে কেউ ঘরে বসেই অপার্থিব অনুসন্ধানকারী (virtual explorer) হতে পারেন।

     গত ১০০ বছরে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন “ভৌগোলিক কৌশল” অধ্যয়নরত বিজ্ঞানীদের জন্য এক অনন্য বিশেষত্বের জন্ম দিয়েছে। বিমান থেকে জমির ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে। এখন, অনেক স্যাটেলাইট ও অন্যান্য যান রয়েছে যা ভূগোলবিদদের পৃথিবী গ্রহের পৃষ্ঠটি দেখতে কেমন এবং এটি কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করছে।

     মহাকাশ থেকে তোলা ছবি মানচিত্র তৈরি করতে, বরফের  গলন নিরীক্ষণ করতে, বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয় করতে, তেলের ছিটকে পড়া, আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে ও অবিরাম চলতে থাকা কার্য বিশ্লেষণ করতে ব্যবহার করা যেতে     পারে। উদাহরণস্বরূপ,১৯৫৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তোলা স্যাটেলাইট ফটোগুলোর তুলনা  করে, মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ (U.S. Geological Survey) এর বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে আলাস্কার বিউফোর্ট সাগর বরাবর উপকূলীয় ক্ষয়ের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ১৩.৭ মিটার (৪৫ ফুট) উপকূল সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে গেছে।   

     ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা বা GIS (Geographic information systems) এর অধ্যয়ন ভূগোলকে একটি ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিনত করেছে। ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা হল শক্তিশালী ডাটাবেজ  (Database), যা সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করে (মানচিত্র, রিপোর্ট,  পরিসংখ্যান, স্যাটেলাইট ইমেজ, জরিপ, জনসংখ্যার তথ্য এবং আরও অনেক কিছু)এবং প্রতিটি তথ্যকে ভৌগোলিক প্রকিৃয়ার সাথে যুক্ত করে, যেমন ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক। যাকে বলা হয় ভূস্থানিক তথ্য (Geospatial information)। জিআইএস প্রযুক্তির অস্তিত্বের আগে এমনভাবে তথ্য সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ ও এতো নিপুণভাবে তথ্যকে ব্যবহার  করা যেত না।  

     GIS-এর জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব একটি নতুন বিজ্ঞানের জন্ম দিয়েছে, যা ভৌগোলিক তথ্য বিজ্ঞান (Geographic information science ) নামে পরিচিত। ভৌগোলিক তথ্য বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির নিদর্শন এবং সেইসাথে মানব উন্নয়ন সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন। তারা প্রাকৃতিক দূর্যোগ সম্পর্কে ও অধ্যয়ন করেন, যেমন ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্ণিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসে  অগ্নিকাড ঘটে, সেই সময়ে ইন্টারনেটে পোস্ট করা একটি মানচিত্রে দেখানো হয়েছিল আগুন ছড়িয়ে পড়তে  বাস্তবে কি পরিমাণ সময় লাগতে পারে, সেই সাথে লোকজনকে দ্রুত আশংকাজনক এলাকা হতে কিভাবে  সরানো যাবে । জিআইএস, ভৌগলিক  দৃষ্টিকোণ থেকে মানব সংগ্রামকেও (human struggles) চিত্রিত করতে পারে, যেমন মে ২০০৯ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস দ্বারা প্রকাশিত “ইন্টারেক্টিভ অনলাইন মানচিত্র (the interactive online map )” যাতে নিউ ইয়র্ক সিটি এলাকার আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের বসতি হারিয়ে ফেলার হারকে (building foreclosure rates) দেখানো হয়েছিল।

     প্রাকৃতিক দৃশ্যকে, কম্পিউটার এর সাহায্যে তৈরি মানচিত্র এবং ডায়াগ্রাম এর মধ্যমে উপস্থাপন করার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, যা অতি সহজে পরিবেশগত এবং সামাজিক সমস্যা মানুষকে বুঝতে সাহায্য করে। সরকারি সংস্থার যেখানে উন্নয়ন করতে হবে তা নির্ধারণ করতে, উদ্যোক্তাদের যেখানে নতুন ব্যবসার সন্ধান করতে হবে তা চিহ্নিত করতে, এই ভূ-স্থানিক তথ্যের উচ্চ চাহিদা রয়েছে।

 

     ভৌগোলিক কৌশল এর শাখা (Brances of Geographic Techniques):

     ক। মানচিত্রাংকন বিদ্যা (Cartography)

     খ। জরিপ (Survey)

     গ। ভৌগোলিক তথ্য ব্যবস্থা (Geographic information systems)

     ঘ। ভৌগোলিক তথ্য বিজ্ঞান (Geographic information science )

     ঙ। ভূগোলে সংখ্যাতাত্ত্বিক কৌশোল (Quantative Technique in Geography)

     চ। গাণিতিক ভূগোল (Mathmetical Geography)  

     ছ। ফলিত ভূগোল (Applied Geography)

 

     ৩.৪. আঞ্চলিক ভূগোল (Regional Geography)

    আঞ্চলিক ভূগোলবিদরা  আঞ্চলিক বিশেষীকরণের জন্য কিছুটা ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। সাধারণত, একটি অঞ্চলের সাধারণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহের দিকে তাদের মনোযোগ নিবেশিত হয়। একজন আঞ্চলিক ভূগোলবিদ যেমন এশিয়ার গবেষনায় বিশেষজ্ঞ হতে পারেন তেমনি অন্য একজন আফ্রিকার গবেষণায় বিশেষজ্ঞ হতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে অঞ্চলটির মানুষ, জাতি, নদী, পর্বত, মরুভূমি, আবহাওয়া, বাণিজ্য এবং মহাদেশের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যগুলি পর্যবেক্ষণ এবং নথিভুক্ত করা হয়। একটি অঞ্চল বিভিন্ন উপায়ে সংজ্ঞায়িত  করা যেতে পারে। যেমন, কোন একটি এলাকা একই সঙ্গে  ভিন্নভিন্ন  জলবায়ু অঞ্চল, সাংস্কৃতিক অঞ্চল,রাজনৈতিক অঞ্চল হিসাবে চিহ্নিত হতে পারে। প্রায় সকল আঞ্চলিক ভূগোলবিদদের,  প্রাকৃতিক  ভূগোলে ​​অথবা মানব ভূগোলে বিশেষত্বের পাশাপাশি একটি আঞ্চলিক বিশেষত্ব থাকে।

     আঞ্চলিক ভূগোলবিদরা শহুরের একটি ছোট এলাকাকে যেমন অধ্যয়ন করতে পারেন। আবার, ঢাকার মতো দ্রুতবর্ধণশীল শহররের সম্পর্কেও আগ্রহী হতে পারেন। তারা পরিবহন, স্থানান্তর, আবাসন এবং ভাষার ব্যবহার, সেইসাথে প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদানগুলির উপর মানুষের প্রভাব সম্পর্কে অধ্যয়ন করেন।

     আঞ্চলিক ভূগোল এর শাখা (Brances of Regional Geography)

     ক। নগর ভূগোল (Urban Geography)

     খ। গ্রামিণ ভূগোল (Rural Geography)

     গ। বসতি ভূগোল (Settlement Geography)

    ঘ। অঞ্চল পরিকল্পনা (Regional planning)

    ঙ। পরিবহন ভূগোল (Transport Geography) 

 

 

 

     ৪.উপসংহার(Conclusion):

     ভূগোলকে একটি সুশৃঙ্খল বিষয় হিসাবে অথবা বিশ্বের একটি মৌলিক বিষয় হিসাবে বিবেচনা করা হোক আর না হোক,বিষয় হিসাবে ভূগোল সম্পর্কে জানাটা গুরুত্বপূর্ণ। ভূগোলের কিছু উপলব্ধি অত্যাবশ্যক কারণ মানুষের বিশ্বকে উপলব্ধি করতে হলে এবং এতে তাদের অবস্থান বুঝতে হলে ভূগোলের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানের মধ্যে সংযোগ সম্পর্কে সচেতন হতে, কোন স্থানে মানুষ সম্মিলিত হওয়া  এবং এর দ্বারা কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলি সংঘটিত হয় তা নির্ণয় করতে ভূগোল সহায়তা করে। পরিশেষে, ভূগোল  সম্পর্কে কিছু জানলে তা, মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, মানুষকে অন্যান্য মানুষ এবং স্থান সম্পর্কে কৌতূহলী করে তোলে।

 

 

 

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ